আঠারো শতকের মাঝামাঝিতে ইংল্যান্ডে শুরু হওয়া প্রথম শিল্প বিপ্লব ধীরে ধীরে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছিল। ইংল্যান্ডের চেষ্টা ছিল এ-সংক্রান্ত জ্ঞান ও দক্ষতা আটকে রাখা। শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। কীভাবে ইংল্যান্ড থেকে শিল্প বিপ্লব ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছিল, তা নিয়ে ব্রিটানিকার দ্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভল্যুশন এবং ভার্সিটি টিউটরসের দ্য স্প্রেড অব ইন্ডাস্ট্রি থ্রোআউট ইউরোপ প্রবন্ধ অবলম্বনে লিখিত জীবনজয়ীর প্রতিবেদন পড়ুন নিচে।
ইংল্যান্ডেই কেন শুরু হয়েছিল?
গল্পটা শুরু হয়েছিল ১৮ শতকের মাঝামাঝি ইংল্যান্ডে। তখন দেশটিতে শিল্প গড়ে ওঠার জন্য বেশ কিছু সুবিধা ছিল। কয়লা ও লোহার মজুত ছিল প্রচুর। ব্যাংকিং ব্যবস্থাও ছিল তুলনামূলকভাবে উন্নত। কৃষিতে পরিবর্তনের ফলে শ্রমিক ও বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছিল।
একের পর এক নতুন যন্ত্রও তৈরি হচ্ছিল। ফলে আগের চেয়ে দ্রুত এবং বেশি পরিমাণে পণ্য তৈরি করা সম্ভব হচ্ছিল। ইংল্যান্ড খুব দ্রুত একটি নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
কিন্তু তারা এই সুবিধা সহজে অন্যদের দিতে চায়নি।
প্রযুক্তি ও দক্ষতা আটকে রাখা যায় নি
ইংল্যান্ড দক্ষ শ্রমিকদের দেশ ছাড়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। শিল্পের যন্ত্রপাতি বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রেও ছিল নানা বাধা। উদ্দেশ্য ছিল পরিষ্কার; নতুন প্রযুক্তির সুবিধা যেন ইংল্যান্ডের মধ্যেই থাকে।
কিন্তু জ্ঞানকে সীমান্তের মধ্যে আটকে রাখা কঠিন ছিল। ব্রিটিশ প্রকৌশলী, শ্রমিক ও উদ্যোক্তারা শেষ পর্যন্ত ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যেতে শুরু করেছিলেন। তাঁদের সঙ্গে গিয়েছিল নতুন প্রযুক্তি, কাজের পদ্ধতি এবং কারখানা পরিচালনার অভিজ্ঞতা।
এভাবেই ইংল্যান্ডের শিল্পজ্ঞান প্রথমবারের মতো বড় পরিসরে দেশের বাইরে ছড়িয়ে পড়েছিল।
বেলজিয়াম ছিল প্রথম শিল্পোন্নত দেশ
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রথম গন্তব্যগুলোর একটি ছিল বেলজিয়াম। দেশটির নিজস্ব কয়লা ও লোহার মজুত ছিল। ফলে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করার মতো প্রয়োজনীয় সম্পদও সেখানে পাওয়া গিয়েছিল।
ব্রিটিশ প্রযুক্তি সেখানে পৌঁছানোর পর স্থানীয় উদ্যোক্তারাও এগিয়ে এসেছিলেন। ককারিল পরিবারের মতো শিল্পপতিরা লোহা ও যন্ত্র তৈরির কারখানা গড়ে তুলেছিলেন। একই সময়ে সরকার রেলপথ নির্মাণে বিনিয়োগ করেছিল।
ফলে বেলজিয়াম খুব দ্রুত ইউরোপের অন্যতম প্রধান শিল্পাঞ্চলে পরিণত হয়েছিল।
ফ্রান্সে পরিবর্তন এসেছিল অন্যভাবে
শিল্প বিপ্লবের প্রভাব এরপর পৌঁছেছিল ফ্রান্সে। তবে সেখানে গতি ছিল তুলনামূলক কম। ছোট কারখানা ও কারিগরদের পুরোনো ব্যবস্থা তখনও শক্তিশালী ছিল। তাই বড় কারখানাভিত্তিক উৎপাদন ইংল্যান্ডের মতো দ্রুত জায়গা করে নিতে পারেনি।
তবু নতুন প্রযুক্তি থেমে থাকেনি। বিনিয়োগ বাড়ছিল। রেলপথ তৈরি হচ্ছিল। নতুন কারখানাও গড়ে উঠছিল। সময়ের সঙ্গে ফ্রান্সও ইউরোপের শিল্প অর্থনীতির অংশ হয়ে উঠেছিল।
জার্মানির সামনে খুলে গিয়েছিল বড় বাজার
জার্মান রাজ্যগুলোর পরিস্থিতি ছিল আরও ভিন্ন। রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত থাকার কারণে এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে ব্যবসা করা সহজ ছিল না। ১৮৩৪ সালে জলফেরাইন (Zollverein) তৈরি হওয়ার পর এই পরিস্থিতি বদলে গিয়েছিল। জলফেরাইন ছিল জার্মানির অর্থনৈতিক ও শুল্কবিষয়ক সংঘ, যার মাধ্যমে বিভিন্ন জার্মান রাজ্যের মধ্যে অনেক শুল্ক বাধা তুলে দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে জার্মানজুড়ে একটি বড় অভ্যন্তরীণ বাজার তৈরি হয়েছিল।
এরপর রেলপথ সেই বাজারকে আরও ভালোভাবে যুক্ত করেছিল। ব্যাংক ও বিনিয়োগকারীরাও নতুন শিল্পে অর্থ দিতে শুরু করেছিলেন। ফলে জার্মান অঞ্চলে শিল্পের বিস্তার দ্রুত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে জার্মানি ইউরোপের অন্যতম বড় শিল্পশক্তিতে পরিণত হয়েছিল।
সবার গল্প এক ছিল না
ইউরোপের অন্যান্য দেশেও এই পরিবর্তনের প্রভাব পৌঁছেছিল। তবে সবাই একই সময়ে বা একইভাবে এগোয়নি।
রাশিয়ায় শিল্পের বিকাশ অনেকটাই পরে হয়েছিল। সেখানে সরকার রেলপথ ও ভারী শিল্পে বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছিল। ইউরোপের আরও অনেক দেশেই শিল্পের বিস্তার হয়েছিল ১৯ শতকের শেষদিকে। তবে তা সব অঞ্চলে সমানভাবে ছড়ায়নি।
একটি দেশ থেকে পুরো মহাদেশে
শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের প্রযুক্তি শুধু প্রযুক্তি হিসেবেই অন্য দেশে যায়নি। তার সঙ্গে গিয়েছিল নতুন ধরনের উৎপাদন পদ্ধতি এবং শিল্প পরিচালনার অভিজ্ঞতা। অন্য দেশগুলো নিজেদের সম্পদ, বাজার ও রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে সেগুলো মিলিয়ে নিয়েছিল।
তাই ইউরোপে শিল্পায়নের গল্পটি ছিল এক দেশ থেকে আরেক দেশে একই ঘটনা হুবহু ছড়িয়ে পড়ার গল্প নয়। ইংল্যান্ড পথ দেখিয়েছিল। বেলজিয়াম সেই পথ দ্রুত গ্রহণ করেছিল। ফ্রান্স নিজের গতিতে এগিয়েছিল। জার্মানি বড় বাজার ও রেলপথের সুবিধা কাজে লাগিয়েছিল। আর বাকিরা পরে আস্তে আস্তে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেই পরিবর্তন গ্রহণ করেছিল।
এভাবেই ইংল্যান্ডে শুরু হওয়া একটি পরিবর্তন ধীরে ধীরে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে পুরো ইউরোপের অর্থনৈতিক চেহারা বদলে দিয়েছিল।