রোবট শব্দটি এসেছে স্লাভিক ভাষার রোবোটা থেকে। যার আক্ষরিক অর্থ একঘেয়েমি খাটুনি বা পরিশ্রম করতে পারে এমন কোনো যন্ত্র। দেখতে দেখতে অনেক দিন হয়ে গেল রোবট শব্দটি সাধারণ মানুষের আলাপে চলে এসেছে। আমেরিকান সায়েন্স ফিকশন কিংবা দক্ষিন ভারতের রজনীকান্তের মুভিতে রোবটের জয়জয়কার! সায়েন্স ডাইরেক্ট, ইঞ্জিনিয়ার্ড আর্টসশ বিভিন্ন সূত্র অবলম্বনে পড়ুন জীবনজয়ী প্রতিবেদন।
উন্নত কিংবা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে রোবটের ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। আমেরিকার সামরিক কাজ বা জাপানের চিকিৎসাক্ষেত্রে কিংবা চীনের সড়কে মনুষ্য পুলিশের দায়িত্বে রোবটের ভূমিকা ক্রমশ বাড়ছে। সাধারণত কঠিন ও সংকটাপন্ন কাজে রোবট ব্যবহৃত হলেও, ইদানীং মানুষের নিঃসঙ্গতা কাটানোর সঙ্গী কিংবা যোগাযোগের জন্য রোবটের ব্যবহার বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। আজকাল কোম্পানিগুলো হিউমানয়েড (মানবিক) রোবট তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছে। একাজে তারা সফলতার দেখাও পাচ্ছে।
মানবিক রোবট হলো এমন এক ধরনের রোবট—যেগুলো মানুষের মতো দেখতে এবং মানুষের মত কাজ করতে সক্ষম। এদের মুখের অভিব্যক্তি, অঙ্গভঙ্গিও মানুষের মতো। এরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে মানুষের মতো চিন্তা করা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণেও সিদ্ধহস্ত। মানবিক রোবটগুলো শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, শিল্প, বিনোদন ছাড়াও সামাজিক যোগাযোগে দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে।
রিয়ালবোটিক্স ও ইঞ্জিনিয়ারড আর্টস এমন দুটি কোম্পানি যারা মানবিক রোবট তৈরি করে থাকে। মেলোডি ও আরিয়া-রিয়ালবটিক্স এবং এমিকা-ইঞ্জিনিয়ারড আর্টসের তৈরি তিনটি অত্যাধুনিক মানবিক রোবট। চলুন এদের বৈশিষ্ট্য এবং কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কিছুটা ধারণা নেওয়া যাক।
মেলোডি : আমেরিকান সংস্থা রিয়েলবোটিক্সের তৈরি এই সুদর্শনা রোবটকে দেখে ভ্রমের শিকার হতে পারেন আপনিও। ছিপছিপে শরীরের মেলোডি যেন মানব তরুণী। মানবী ভ্রমের জন্য অবশ্য কিছু আধুনিক প্রযুক্তি দায়ী। মেলোডির শরীরে ব্যবহার করা হয়েছে সিন্থেটিকের তৈরি আধুনিক ত্বক। মুখের অঙ্গভঙ্গি নকলেও মেলোডি অনন্য। মানুষের সাথে সাবলীলভাবে কথা বলতে পারে, এমনকি গান গাইতেও পারে এই অত্যাধুনিক মানবিক রোবটটি। তাপমাত্রার পরিবর্তন মেলোডি ওপর প্রভাব ফেলতে পারে না। মেলোডি রিয়েলবোটিক্সের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাথে খুব সহজে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে, এমনকি ওপেনএআই ও চ্যাটজিপিটির সাথেও কাজ করতে সক্ষম। ব্যবহারকারীর পছন্দের ওপর ভিত্তি করে নতুনভাবে নিজেকে পরিবর্তন করতে পারে মেলোডি। এছাড়া রোবটটিকে স্যুটকেস বহন করা যায়। সাধারণত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার কাজে বেশি ব্যবহৃত হয়। এই মানবিক রোবটটি পেতে আপনাকে গুনতে হবে ১ লক্ষ ৭০ ইউএস হাজার ডলার।
আরিয়া : রিয়েলবোটিক্স কোম্পানির আরেকটি মানবিক রোবট হলো আরিয়া। মেলোডির মতো আরিয়াও মানুষের মতো কথাবার্তা ও অভিব্যক্তি দেখাতে সক্ষম। ব্যবহারকারীরা খুব সহজে এর মুখের গঠন ও চুলের রঙ পালটে ফেলতে পারে। নতুন চেহারার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ধারনেও পারদর্শী আরিয়া। ১৭ টি মোটরের সাহায্যে এই রোবটটি চোখ ও মুখের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করে থাকে এবং নিজের হাতের আঙুল নাড়াতে পারে। এছাড়া আরিয়ার চোখে রয়েছে গোপন ক্যামেরা—যার সাহায্যে কোনো ব্যক্তির কর্মকাণ্ড বা বস্তুকে সহজে পর্যবেক্ষণ করে সেই বিষয়ে আলোচনা করতে পারে। আরিয়া রোবটের তিনটি মডেল বাজারে পাওয়া যায়।
বাস্ট মডেল : সবচেয়ে সাশ্রয়ী। এখানে শুধু মাথা ও ঘাড়ের অংশ থাকে।
মডুলার মডেল : মধ্যম দামের মডেল এটি। সাধারণত এতে শরীরের ওপরের অংশ থাকে এবং বহনযোগ্য।
ফুল স্ট্যান্ডিং মডেল : এটি সবচেয়ে উন্নত ও ব্যয়বহুল মডেল। শরীরের পুরো অংশ থাকে এখানে।
সাধারণত মানুষের নিসঃঙ্গতা দূর করার সঙ্গী হিসেবে ব্যবহৃত হয় এই রোবটটি। সিইও এন্ড্রু কিগাল আরিয়াকে একটি রোবট নয় বরং অর্থবহ আলোচনা ও বিভিন্ন কাজের সহকারী বলেও উল্লেখ করেছে। আরিয়ার বর্তমান বাজারমূল্য ১ লক্ষ ৭৫ হাজার ইউএস ডলার।
এমিকা : ইঞ্জিনিয়ারড আর্টসের তৈরি এমিকা বিশ্বের অন্যতম আধুনিক মানবিক রোবট। মানুষের অনুভূতি ও যন্ত্রের যান্ত্রিকতার এক অদ্ভুত সেতুবন্ধ হলো এমিকা। যার মুখের অভিব্যক্তি, চোখের নড়াচড়া ও অঙ্গভঙ্গি খোদ মানুষের মতো! এমিকা মানুষের মতো হাসতে, কাঁদতে ও অবাক হতে পারে। এই বৈশিষ্ট্যগুলো তাকে অন্যান্য মানবিক রোবটের চেয়ে এগিয়ে রেখেছে। এগুলো ৩২টি অ্যাক্টিভেটর, ২৭টি ফেসিয়াল কন্ট্রোল এবং ৫টি নেক মুভমেন্টের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। এছাড়া এমিকা জটিল বাক্য বুঝতে পারে এবং মৌখিক ও অমৌখিকভাবে প্রতিক্রিয়াও ব্যক্ত করতে পারে। শিল্প, শিক্ষা ও জনসাধারণের সাথে যোগাযোগের কাজে এই মানবিক রোবটকে ব্যবহার করা হয়। এছাড়া বৈজ্ঞানিক গবেষণাতেও ব্যবহৃত হয়। মজার ব্যাপার হলো, এরিকার ডেস্কটপ ভার্সনও এখন হাতের নাগালে। ১ লক্ষ ৭৫ হাজার ইউএস ডলারে আপনিও পেতে পারেন এমিকা নামক মানবিক রোবটটিকে!