“ড্রাকুলা” নামটি উচ্চারিত হলেই চোখে ভেসে ওঠে বিভীষিকাময় এক ভ্যাম্পায়ারের অবয়ব—অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা, মানুষের রক্তের পিপাসায় অপেক্ষমাণ। ড্রাকুলাকে নিয়ে আমাদের প্রচলিত ধারণা মূলত এই ভয় ও রহস্যকে ঘিরেই। আমরা তাকে ভয় পেতে ভালোবাসি। কিন্তু গবেষণার কিছু ধারা এই পরিচিত ছবিটিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। সেসব মতে, ড্রাকুলা কেবল রক্তচোষা কোনো কাল্পনিক চরিত্র নন; তিনি ছিলেন রক্ত-মাংসের এক বাস্তব মানুষ—একজন বীর প্রতিরোধ যোদ্ধা। যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন কলেজের ইস্ট ইউরোপিয়ান রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক এমিরিটাস অধ্যাপক রাদু আর ফ্লোরেস্কুর “Dracula: Hero or Villain?” প্রবন্ধসহ বিভিন্ন উৎস অবলম্বনে জীবনজয়ীর এই প্রতিবেদন—“প্রতিরোধ যোদ্ধা ড্রাকুলা”। উল্লেখ্য, অধ্যাপক রাদু ১৯৯৯ সালে স্মিথসোনিয়ান ফোকলোর ফেস্টিভ্যালে তাঁর প্রবন্ধটি উপস্থাপন করেন।
ড্রাকুলার পূর্ণ নাম তৃতীয় ভ্লাদ ড্রাকুলা; তিনি ‘ভ্লাদ দ্য ইম্পেলার’ নামেও পরিচিত। ১৪৩১ সালে রুমানিয়ার ট্রান্সিলভানিয়া অঞ্চলের সিগিশোয়ারায় তাঁর জন্ম, আর ১৪৭৬ সালে বুখারেস্টে তাঁর মৃত্যু ঘটে।
সময়টা পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি। অটোমান সাম্রাজ্যের প্রভাব ক্রমশ পূর্ব ইউরোপে বিস্তৃত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ভ্লাদ শাসন করছিলেন ওয়ালাকিয়া অঞ্চল—যা ভৌগোলিকভাবে দক্ষিণে অটোমান ও উত্তরে হাঙ্গেরির মাঝখানে অবস্থিত। ফলে রাজ্যটি সর্বদাই ছিল রাজনৈতিক ও সামরিক চাপে।কিন্তু ভ্লাদ ছিলেন আপসহীন। সমসাময়িক অনেক শাসকের মতো তিনি বিদেশি শক্তির কাছে নতি স্বীকার করে ক্ষমতা ধরে রাখতে চাননি। বরং তিনি বেছে নেন প্রতিরোধের পথ। শত্রুর বিরুদ্ধে নির্মম ও কার্যকর কৌশল প্রয়োগের জন্য তিনি ‘তেপেশ (Tepes)’ বা ‘শূল বিদ্ধকারী’ উপাধি লাভ করেন।
১৪৬২ সালে অটোমানরা বিশাল বাহিনী নিয়ে ওয়ালাকিয়া আক্রমণ করে। সরাসরি সংঘর্ষে না গিয়ে ভ্লাদ প্রয়োগ করেন পোড়ামাটি নীতি, গেরিলা আক্রমণ এবং মনস্তাত্ত্বিক সন্ত্রাসের কৌশল। এসব পদ্ধতি শত্রুর মনোবল ভেঙে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাঁর কৌশলগুলো ছিল নিঃসন্দেহে কঠোর ও নির্মম, তবে উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট—প্রবল শক্তিশালী শত্রুর হাত থেকে নিজের রাজ্যকে রক্ষা করা। ধারণা করা হয়, অটোমানদের সঙ্গে সংঘর্ষেই তিনি প্রাণ হারান।
তবে ড্রাকুলার এই বাস্তব পরিচয় পাশ্চাত্য ইউরোপে খুব একটা প্রতিফলিত হয়নি। ট্রান্সিলভানিয়ায় বসবাসকারী জার্মানভাষী স্যাক্সন বণিকদের সঙ্গে তাঁর তীব্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব ছিল। তারাই প্রথম তাঁকে নৃশংস ও নির্দয় শাসক হিসেবে চিত্রিত করে। পরবর্তীতে এই বর্ণনা প্রোপাগান্ডার রূপ নেয়, যেখানে তাঁকে এক রক্তচোষা দানব হিসেবে উপস্থাপন করা হয়—একটি চরিত্র, যার মধ্যে মানবিকতার কোনো স্থান নেই। এভাবেই ভ্লাদ ড্রাকুলা পাশ্চাত্য কল্পনায় দেশপ্রেমিক শাসক থেকে পরিণত হন আতঙ্কের প্রতীকে। এই ধারণাকে আরও জনপ্রিয় করে তোলেন আইরিশ লেখক ব্রাম স্টোকার। ১৮৯৭ সালে প্রকাশিত তাঁর উপন্যাস Dracula-তে তিনি ড্রাকুলাকে রক্তপিপাসু ভ্যাম্পায়ার হিসেবে চিত্রিত করেন। প্রকৃত ভ্লাদ সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান ছিল সীমিত; তবু এই কল্পিত চরিত্রই বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পায়। ফলে ইতিহাসের বাস্তব ড্রাকুলা আড়ালে পড়ে যায়, আর সামনে আসে ভৌতিক কাহিনির এক পিশাচ। ড্রাকুলাকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই কাহিনিগুলো পশ্চিম ইউরোপের চোখে পূর্ব ইউরোপ সম্পর্কে প্রচলিত ভীতি ও রহস্যময়তার প্রতিফলনও বটে। ভিক্টোরিয়ান যুগের ইংল্যান্ডে কল্পিত কাউন্ট ড্রাকুলা অভিবাসন, রোগব্যাধি ও নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতীক হয়ে ওঠেন।
অন্যদিকে, আজকের রোমানিয়ায় তৃতীয় ভ্লাদকে জাতীয় বীর হিসেবে স্মরণ করা হয়। তাঁর স্মৃতিতে নির্মিত হয়েছে নানা স্থাপনা, এবং অনেক রোমানিয়ান তাঁকে অটোমানদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে দেখেন। নিষ্ঠুরতার জন্য নয়, বরং সার্বভৌমত্ব ও ন্যায়ের প্রতি তাঁর অটল অঙ্গীকারের জন্যই তাঁকে মূল্যায়ন করা হয়।
ভ্লাদ ড্রাকুলার এই ‘দানবীয় রূপদান’ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে—ইতিহাসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে? নায়ক কীভাবে খলনায়কে পরিণত হয়? ভ্লাদের ক্ষেত্রে একপাক্ষিক বয়ান তাঁর জটিল ও বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বকে মুছে দিয়ে তাঁকে একমাত্রিক দানবে রূপ দিয়েছে। তবে আজ, যখন তাঁর ঐতিহাসিক মর্যাদা পুনর্মূল্যায়নের চেষ্টা চলছে, তখন ধীরে ধীরে সামনে আসছে এক ভিন্ন ড্রাকুলা—যার পরিচয় কেবল ভয় নয়; বরং প্রতিরোধ, আত্মপরিচয় এবং বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে অবিরাম সংগ্রামের ইতিহাস।