ভবিষ্যৎ ব্যাপারটাই বেশ বিপজ্জনক! অনিশ্চিতও বটে। আর তা যদি হয় ভূতের ভবিষ্যৎ তবে তো কথাই নেই। তার ওপর আবার বাঙাল ভূত! তার মানে ইংরেজ ভূতও আছে? বাঙাল ভূত থাকলে ইংরেজ ভূত থাকাটাই স্বাভাবিক। বাঙাল-ইংরেজ থাকলে ফরাসি, রাশিয়ান, আফ্রিকান এই সমস্ত ভূত থাকাটাও অস্বাভাবিক নয়।
যুগে যুগে ভূত নিয়ে পৃথিবীতে এন্তার গল্প বা কল্পকাহিনি রচিত হয়েছে। অধিকাংশ বিজ্ঞানী ভূতের অস্তিত্ব উড়িয়ে দিলেও প্রকৃতির রহস্যময় অনেক আচরণ মানুষকে ভূত নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে। মানুষকে পেয়ে বসে ভূতের ভয়। ভূত নিয়ে জুতসই প্রবাদ-প্রবচনেরও কমতি নেই। ভূতের মুখে রাম নাম, সুখে থাকলে ভূতে কিলায়, দশচক্রে ভগবান ভূত—এমন অসংখ্য প্রবাদ প্রবচন নিত্য শোনা যায় লোকমুখে। এসব প্রবাদ প্রবচনই বলে দেয় বাঙালির জীবনে ভূত কতটা জেঁকে বসে আছে।
সব ভূত আবার দেখতে এক রকম নয়। বাঙালির জীবনে ভূত এসেছে নানান নামে, নানান সাজে। কখনো পেত্নী, শাকচুন্নি, ডাইনি হয়ে, কখনও আবার মেছোভূত, গেছোভূত, মামদো ভূত, নিশি ভূত হয়ে বাঙাল ভূত ধরা দিয়েছে বাংলা পুরাণে।
পেত্নী মূলত নারী ভূত। অতৃপ্ত আশা নিয়ে বা অবিবাহিত অবস্থায় যে নারীরা মৃত্যুবরণ করে, তাদের পেত্নী বলে মনে করে অনেকে। অন্যদিকে বিবাহিত নারীরা মৃত্যুর পর শাকচুন্নি হয়ে ফিরে আসে। সাদা শাড়ি, হাতে শাঁখা-পলা পরে এই ভূত ঘুরে বেড়ায় রাতের অন্ধকারে। ডাইনির কথাও লোকমুখে শোনা যায় হামেশাই। ডাইনি কোনো আত্মা নয়, এদের জীবিত নারী মনে করে অনেকে। এরা সাধারণত বৃদ্ধ নারী। কালো জাদু’র সাহায্যে প্রতিপক্ষের ক্ষতি করে। বয়স বাড়লেও ডাকিনী বিদ্যার মাধ্যমে এরা নিজেদের যৌবন ধরে রাখে। ছেলেদের মন ভুলিয়ে নিজেদের ফাঁদে ফেলে। প্রচলিত আছে, গ্রামের ছোট ছেলে-মেয়েদের ভুলিয়ে নিয়ে যায় এরা। তারপর হত্যা করে তাদের রক্ত খেয়ে বেঁচে থাকে বছরের পর বছর।
অন্যদিকে মেছোভূত বাঙালির কাছে খুবই পরিচিত ভূত। সাধারণত মাছ খেতে ভালোবাসে বলে এই ভূতদের মেছোভূত নামে ডাকে অনেকে। তাই রাত-বিরাতে বাজার থেকে মাছ নিয়ে বাড়ি ফিরতে গেলে অনেকে দুশ্চিন্তায় থাকে। এই বুঝি মেছোভূত পিছু নিল! নিশি ভূতের কথাও শোনা যায় প্রায়ই। সবচেয়ে ভয়ংকর ভূত এই নিশি ভূত। গভীর রাতে শিকারকে তার প্রিয় মানুষের গলায় নাম ধরে ডাকে নিশি ভূত। এই নিশি ভূতের পাল্লায় পড়লে আর রক্ষা নেই। একবার তার ডাকে কেউ গভীর রাতে বাড়ির বের হলে আর বাড়ি ফেরা হয় না তার। মামদো ভূতের কথাও শোনা যায় অনেকের মুখে। হিন্দু মতে, মুসলমান ব্যক্তির অতৃপ্ত আত্মাকে মামদো ভূত নামে ডেকে থাকে অনেকে। গেছো ভূতের নাম থেকেই বোঝা যায় এই ভূত গাছে গাছে বিচরণ করে।
যুক্তিবাদী বিজ্ঞানমনস্করা অবশ্য সব সময় সন্দেহ প্রকাশ করেছেন ভূতের অস্তিত্বে। তাদের মতে, জগতে ভূত যে আছে, তার প্রমাণ কোথায়? ভূত যদি থেকেই থাকে তবে দিনের আলোয় লোকালয়ে এসে ধরা দেয় না কেন? অন্যদিকে ভূতবাদীরা যেন আরেক কাঠি সরেস। তাদের পাল্টা প্রশ্ন, ভূত যে নেই, তারই বা প্রমাণ কোথায়? ভূতের ভয়ে অনেকেরই তো দাঁতে দাঁত লেগে যায়। হাঁটুতে শুরু হয় ঠোকাঠুকি। সুতরাং মুরগি আগে না ডিম আগে এমন বিতর্কের মতো ভূতের থাকা না থাকাটাও একটা অমীমাংসিত বিষয় হয়ে ঝুলে আছে যুগ যুগ ধরে।
ভারতীয় উপমহাদেশে ভূতের অস্তিত্বের সন্ধান মেলে মূলত মানুষের বিশ্বাসে। বহুকাল ধরে ভূতের আগমনকে কেন্দ্র করে রীতিমতো ভূত চতুর্দশী উৎসব পালিত হয়ে আসছে এ অঞ্চলে। ভূত চতুর্দশী একটি বার্ষিক উৎসব। মূলত সনাতন ধর্মের লোকজন এ উৎসবটি পালন করে ঘটা করে। দীপাবলির পাঁচ দিনব্যাপী উৎসবের দ্বিতীয় দিন এটি পালিত হয়। চতুর্দশী তিথি সম্পর্কে অবশ্য ভিন্ন ভিন্ন মতামত রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন দেবী কালী চামুন্ডা রূপে ভূত এবং প্রেতাত্মা সঙ্গে নিয়ে ভক্তের বাড়ি হাজির হন অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটাতে। কারও মতে এই তিথিতে দৈত্যরাজ বলি পৃথিবীতে পূজা নিতে আসেন। সঙ্গে আসে নানা অশুভ শক্তি, অর্থাৎ ভূত এবং প্রেতাত্মা। অনেকে আবার মনে করেন পূর্বপুরুষের আত্মা এই তিথিতে মর্ত্যলোকে আসেন। তবে সবক্ষেত্রেই অশুভ শক্তির আগমনের উল্লেখ মেলে। এই অশুভ শক্তি থেকে মুক্তির উদ্দেশ্যেই জ্বালানো হয় চৌদ্দটি প্রদীপ। অনেকের বিশ্বাস এই চৌদ্দ প্রদীপের আলো সংসারে সকল প্রকার অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটায়। এ তিথিতে চৌদ্দ প্রকার শাক খাওয়ারও চল আছে। অশুভ শক্তি বিনাশের উদ্দেশ্যে গোসল সেরে এই চৌদ্দশাক খেয়ে চৌদ্দ প্রদীপ জ্বালানোই হলো ভূত চতুর্দশীর রীতি। এভাবেই যুগে যুগে ভূত যেন জেঁকে বসেছে অনেকের মনে বা বিশ্বাসে।
ছেলেবেলায় বাড়ির আঙিনায় শীতল পাটি বিছিয়ে বড়দের কাছে ভূতের গল্প শুনেছি অনেক। বইয়েও পড়েছি। সেকালে ভূত মানে ছিল রাতের বেলায় তালগাছের মাথায়, বটগাছের ডালে, নির্জন মেঠোপথে বা পুকুর পাড়ের বাঁশঝাড়ে সাদা লম্বা ছায়ার লুকোচুরি খেলা। বেমক্কা সেই সাদা লম্বা ছায়া দেখে ভূত বলে চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারিয়েছেন কেউ কেউ। দৌড়ে বাড়ি এসে ঘরের দাওয়া বা উঠোনে হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন বহু বীরপুরুষ। তারপর বেলুনের মতো সেই গল্প ফুলিয়ে ফুলিয়ে বড় করে ছড়িয়ে দিয়েছেন গ্রাম থেকে গ্রামে। বাঙাল ভূত মানেই যেন লম্বা সাদা একটা ছায়া। মাথাটা কখনও কখনও আকাশে গিয়ে ঠেকেছে! লম্বা লম্বা হাত-পা। মুখটা যেন থেকেও নেই। ঠিক দেখতে পায় না কেউ। লম্বা লম্বা কদম ফেলে বহু দূর থেকে এসে সেই বেয়াড়া ভূত পিছু নেয় পলকে। কখনও কখনও নারী ভূতের সঙ্গেও দেখা হয়ে যায় অনেকের। ঢিলে ঢালা পোশাক। হাতে-পায়ে লম্বা লম্বা নখ। এলোমেলো চুলগুলো মুখের সামনে এনে মুখ ঢেকে কখনও হাসে। কখনও ভয়ানক দৃষ্টিতে গম্ভীর মুখে এগিয়ে আসে। যার দিকে এগিয়ে আসে ভয়ে সে বেচারার আত্মারাম খাঁচা ছাড়ার উপক্রম হয়। অবশ্য আমাদের নানি-দাদিদের গল্পে উপকারী বা নিরীহ ভূতের কথাও শুনতে পেতাম প্রায়ই। তবে সেসব উপকারী বা নিরীহ ভূতের বাস্তবে খুব একটা দেখা মিলত না। তবু সেসব ভালো ভূতের গল্প বলতেন বড়রা। যেন ছোটরা ভয় না পেয়ে ভূতের গল্প উপভোগ করতে পারে।
ভূতের গল্প লেখেননি এমন লেখক বোধহয় খুঁজে পাওয়া মুশকিল। প্রতিবছর বইমেলায় কাঁড়ি কাঁড়ি ভূতের গল্পের বই প্রকাশিত হয়। এসব বইয়ের কাটতিও বেশ ভালো। ভূতের বইয়ের পাঠকের একটা বড় অংশই শিশু-কিশোর। বাঙালির জীবনে ভূত তাই শৈশবেই জেঁকে বসে। বড় বয়সেও অনেকের ভেতর থেকে যায় এই ভয়।
যুগ যুগ ধরে এভাবেই গ্রামবাংলায় বাঙাল ভূতের চেনা অবয়ব দাঁড় করিয়ে রেখেছে বাঙালি। কিন্তু সেই বাঙাল ভূতের ভবিষ্যৎ কী? এক কথায় বলতে গেলে খানিকটা অন্ধকারই বলা চলে। দেশের অবকাঠোমো উন্নয়ন, দেশজুড়ে বিদ্যুতের সরবরাহ, প্রযুক্তি, ইন্টারনেট বা মোবাইলের এই যুগে ভূতও যেন ইদানীং কোণঠাসা বেশ। আগের মতো তাদের আর হুটহাট দেখা মেলে না। গ্রামগুলোতে বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে। রাস্তাঘাটের এন্তার উন্নয়ন হচ্ছে। বাড়ছে গাড়ির সংখ্যা। লোকজনের হাতে হাতে মোবাইল। শহরের সঙ্গে কমছে গ্রামের দূরত্ব। তাই ভূতের ভয়ও কমছে আজকাল। মানে পথে ঘাটে ভূতের দেখা মিলছে কম। বরং মানুষের নানা আগ্রাসনে ভূতরাই যেন তাদের জীবন নিয়ে শঙ্কিত! শেষ পর্যন্ত মানুষের পৃথিবীতে টিকে থাকতে পারবে তো!
ভাবছেন রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ, মোবাইল, ইন্টারনেট এসবের সঙ্গে ভূতের কী সম্পর্ক? সম্পর্ক আছে বৈকি। একসময় সন্ধ্যার পরপরই গ্রামগুলো ডুবে যেত গভীর অন্ধকারে। মূলত অন্ধকার দুর্গম মেঠোপথ, বাঁশঝাড়, পুকুরপাড়, বটতলা বা তালগাছের মাথায় ভূত দেখার অভিজ্ঞতা হতো অনেকের। বিদ্যুৎ সরবরাহের পাশাপাশি মোবাইল-ইন্টারনেটের যুগে রাস্তাঘাট এবং ব্যক্তির মনের আঁধার যত কাটছে, ততই কমছে ভূতের উৎপাত। সে অর্থে ভূতের ভবিষ্যৎ রীতিমতো হুমকির মুখে। বিলুপ্তির পথে গ্রামবাংলার বাঙাল ভূত।
ভূত বরং আজকাল উৎসবের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। তাই আমাদের দেশেও ইদানীং ঘটা করে পালিত হয় পশ্চিমা সংস্কৃতির হ্যালোইন উৎসব। প্রতিবছরের ৩১ অক্টোবর পালিত হয় এই উৎসব। এই ভূতুড়ে উৎসবের ইতিহাস অবশ্য ২ হাজার বছরেরও বেশি পুরনো। অনেকেই ভাবেন, এ দিনটি হয়তো ভূতের মতো সাজতেই পালন করা হয়। বিষয়টি তা নয়। প্রায় দুই হাজার বছর আগে বর্তমান আয়ারল্যান্ড, ইংল্যান্ড ও উত্তর ফ্রান্সে বসবাস করত কেল্টিক নামক জাতিগোষ্ঠী। এই কেল্টিক জাতির ধারণা ছিল অক্টোবরের শেষ দিনের রাতটি সবচেয়ে ভয়ংকর। যে রাতে সব প্রেতাত্মা ও অতৃপ্ত আত্মারা মানুষের ক্ষতি করতে পারে। আর তাই কেল্টিক জাতির মানুষজন এ রাতে বিভিন্ন ধরনের ভূতের মুখোশ ও পোশাক পরে নির্ঘুম রাত কাটাতেন। আগুন জ্বালিয়ে বৃত্তাকারে একসঙ্গে ঘুরতেন ও মন্ত্র জপতেন। সময়ের পরিক্রমায় কেল্টিক জাতির ‘সাহ-উইন’ উৎসবই বর্তমানে ‘হ্যালোইন’ উৎসব হিসেবে পালিত হয় বিশ্বজুড়ে।
আর এই হ্যালোইন উৎসবের আগ্রাসনে বাঙালি ভূতের যে চিরায়ত অবয়ব, তাতে রূপান্তর ঘটছে ক্রমশ। হ্যালোইন উৎসব আর হালের কমিকস-কার্টুন চরিত্রের প্রভাবে জৌলুস আসছে ভূতের অবয়ব বা পোশাকেও। বাঙাল ভূতে ভর করছে পশ্চিমা প্রভাব। ভিনদেশি শহুরে এই ভূতের আগমনে গ্রামবাংলার বাঙাল ভূত তার অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। আমাদের জেন-জি জেনারেশন ভূত বলতে হ্যালোইন উৎসবে দেখা, রঙ-বেরঙের উদ্ভট ও রঙিন সাজের ভূত দেখে এখন আর ভয় নয়, বরং আনন্দিত হয়। ভূত যেন হয়ে উঠেছে বিনোদনের মাধ্যম। এসবের ভিড়ে শেষ পর্যন্ত বাঙাল ভূত টিকে থাকতে পারলেই হয়!