বেলমার্শ প্রিজনকে বলা হয় যুক্তরাজ্যের গুয়ানতানামো বে। আর বেলমার্শের কয়েদিরা বলে হেলমার্শ। এই কারাগারের চারদিকে কঠিন নিরাপত্তা বলয়। এটি ম্যাক্সিমাম সিকিউরিটি প্রিজন, যার ধারণক্ষমতা এক হাজার। যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বেশি মুসলিম কয়েদি রাখা হয় এখানে। আন্তর্জাতিক অপরাধীদের আমেরিকায় প্রত্যর্পণ করার আগে বেলমার্শে রাখা হয়। এখান থেকে কোনো কয়েদির পালিয়ে যাওয়ার রেকর্ড নেই। অতি জঘন্য, ক্ষমতাধর, রাজনৈতিক বন্দী ও হাইপ্রোফাইল কয়েদিদের রাখা হয় এখানে। বিশ্বখ্যাত উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়াস অ্যাসাঞ্জ বেলমার্শে বন্দী ছিলেন ২০১৯ সালের এপ্রিল মাস থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। এই দীর্ঘ সময়ে সাদা লম্বা চুল–দাড়িতে একেবারে দরবেশ বাবার রূপ নিয়েছিলেন তিনি। বেলমার্শের চারটি হাউস ব্লকের ব্লক ১–এ তিনি থাকতেন। আমি বেলমার্শে কাজ শুরু করি ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। একদিন কাজ শেষ করে বাসায় ফেরার সময় দেখি, জেল গেট থেকে একটু দূরে মূল সড়কে কয়েক শ মানুষ বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে আছে। ‘ফ্রি জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ’ লেখা একটি বিশাল ব্যানার গত পাঁচ বছর জেল গেটের বাইরে মূল সড়কের মাঝখানে রাখা ছিল। গাড়িচালকেরা হর্ন বাজিয়ে এই দাবির সাথে একাত্মতা পোষণ করত। এটি প্রায় প্রতিদিনের ঘটনা। মাঝে মাঝে বড় বড় সেলিব্রিটিও আসতেন; লেবার লিডার জেরেমি করবিনও এসেছিলেন একবার। সাংবাদিক আর টিভি ক্যামেরার ভয়ে আমরা কাজ শেষ করে কার পার্কিং থেকেই গাড়ির জানালা বন্ধ করে রাখতাম। অফিস থেকে সাংবাদিকদের সাথে কথা না বলতে একধরনের বার্তা দেওয়া হয়েছিল। আমার কাজের কারণেই হাউস ব্লক ১–এ যেতে হতো প্রায়ই। একদিন সকালে দেখি অ্যাসাঞ্জ জিম করছেন। আমি কাছে গিয়ে ‘হাই জুলিয়ান’ বলায় তিনি একটু চমকে উঠলেন। জেলখানায় কয়েদিদের পারিবারিক নাম ধরে ডাকা হয়। সবাই তাঁকে অ্যাসাঞ্জ বলেই ডাকে। আমি তাঁর ফার্স্ট নেম (জুলিয়ান) ধরে ডাকায় তিনি একটু আশ্চর্য হয়েছিলেন। আমাদের প্রায়ই দেখা হতো। জেলে মোবাইল ফোনের ব্যবহার নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে কোনো সেলফি তোলা হয়নি। বেশির ভাগ সময় দেখা হতো বারান্দায়। আইনজীবীরা আসতেন আর অনেকগুলো ফাইল বগলদাবা করে তিনি নিয়ে যেতেন। আমি তাঁকে সব সময় ‘জুলিয়ান’ বলেই সম্বোধন করতাম। নিজে কিছুদিন সাংবাদিকতা করার কারণে তাঁর প্রতি একধরনের সহমর্মিতা কাজ করত। যারা অপরাধ করেছে, তারা দিব্যি ক্ষমতায় থেকে যাবে আর তাদের অপরাধগুলো সামনে নিয়ে আসার কারণে একজন জেলে পচবে বছরের পর বছর; এ কেমন কথা! দীর্ঘ সময় ধরে অ্যাসাঞ্জ বেলমার্শে থাকলেও অন্য কোনো কয়েদির সাথে তার সখ্য বা বন্ধুতা লক্ষ করা যায়নি। একাই থাকতেন সব সময়। নিজের আইনজীবী ছাড়া কারও সাথে কোনো কথা বলতেন না। সাধারণ কয়েদিরাও তাঁকে খুব ঘাটাত না। প্রশাসন যে তাঁর সঙ্গে ভিন্ন রকম আচরণ করে এবং তিনি যে প্রভাবশালী, অন্য কয়েদিরা এটা বুঝতে পারত। কেউ কেউ তাকে দেমাগি ও বলত। জেলখানায় শিশুহত্যাকারী আর ধর্ষক সবচেয়ে ঘৃণিত। সাধারণ কয়েদিরা এদের সামনে পেলেই মারমুখী হয়ে ওঠে। জেলে তাদের রাখা হয় ভিপি (Vulnerable people) ইউনিটে। তাদের সবকিছু আলাদা। অন্য কয়েদিদের সাথে তাদের মেশানো হয় না। জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ সুইডেনের একটি ধর্ষণ মামলার কারণে সুইডেনে প্রত্যর্পন ঠেকাতে ইকুয়েডেরিয়ান দূতাবাস লন্ডনে অ্যাসাইলাম নিয়েছিলেন, এটাও সাধারণ কয়েদিরা কেউ কেউ জানত। তাঁকে না পছন্দ করার এটাও একটা কারণ হতে পারে। তাঁর একটা বদনাম ছিল; তিনি নাকি গোসল করতেন না নিয়মিত। অসুস্থ অপরিষ্কার বৃদ্ধের মতো মনে হতো তাঁকে সে সময়। বেলমার্শ তাঁকে ঠিকমতো যত্ন করে না, অত্যাচার করে এমন কিছু প্রমাণের জন্য তিনি এমন করতেন বলেও কানাঘুষা প্রচলিত ছিল। জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ বেলমার্শে থাকা অবস্থায় বিয়ে করেছেন ২০২২ সালের মার্চ মাসের ২৩ তারিখে। তাঁর স্ত্রী স্টেলা মরিস। তাঁদের দুই সন্তান, অ্যাসাঞ্জের বাবা ও দুই ভাই বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন। জেল গেটে স্টেলা মরিসকে কেক কেটে উষ্ণ সংবর্ধনা দিয়েছেন শুভানুধ্যায়ীরা। উল্লেখ্য, বেলমার্শে আসার আগে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ ২০১২ সাল থেকে ৭ বছর ইকুয়েডরের লন্ডন এম্বাসিতে বন্দী থাকা অবস্থায় আইনজীবী স্টেলা মরিসের সাথে বন্ধুতা হয়। কেউ কেউ তখন বলেছিলেন, আমেরিকায় প্রত্যর্পণ ঠেকানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে অ্যাসাঞ্জ এই ব্রিটিশ মহিলাকে বিয়ে করেছেন। হাইপ্রোফাইল কয়েদিদের ব্যাপারে বেলমার্শ খুব সতর্ক থাকে। খুব গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়। কর্মকর্তাদের দ্বারা যদি কোনো তথ্য বের হয়ে যায়, এই ভয়ে অনেক কিছু শেয়ার করে না। জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ বেলমার্শে থাকা অবস্থায় পুরো বিশ্বের মিডিয়া বিশেষ করে ব্রিটিশ মিডিয়ার মেইন ফোকাস ছিল তাঁকে ঘিরে। কোনোভাবে জানা হয়ে গিয়েছিল যে আমি বেলমার্শে কাজ করি । বিবিসি বাংলা বিভাগ থেকেও আমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা হয়েছিল। লিঙ্কডইনে আমার প্রোফাইল থেকে তথ্য নিয়ে আরও দুটি ব্রিটিশ মিডিয়া থেকেও আমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা হয়েছে। আসলে তথ্য দেওয়ার মতো তেমন কিছু তো আসলেই ছিল না। হাই–হ্যালো ছাড়া অ্যাসাঞ্জে সাথে নিবিড়ভাবে তো কেউ কথা বলতে পারত না। শুধু তাঁর আইনজীবী আর পরিবারের লোকজন ছাড়া। তালাবদ্ধ সেলে তিনি একাই থাকতেন। সেল থেকে বের হলে সামনে–পেছনে দুজন করে অফিসার থাকত সব সময়। জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের কথা যখনই মনে আসে, চোখের সামনে ভেসে ওঠে শুভ্র লম্বা চুল–দাড়িতে সৌম্য চেহারার মধ্যবয়স্ক একজন মানুষ। অনেকগুলো কাগজপত্রের ফাইল হাতে নিয়ে অলসভাবে বেলমার্শ কারাগারের করিডোর ধরে হেঁটে যাচ্ছেন। সত্য বড় কঠিন, সেই কঠিন সত্য প্রকাশ করার অপরাধে জেলখানার নির্জন বারান্দায় একা হেঁটে যাচ্ছেন সময়ের এক সাহসী সন্তান।