মীর হাসিব কাশ্মীর থেকে ডাক্তারী পড়তে এসেছে ঢাকায় আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজে। জীবনজয়ীর সাক্ষাৎকার বিভাগের জন্য রিতু চক্রবর্ত্তীর সঙ্গে আলাপে হাসিব কথা বলেছেন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষ নিয়ে।
জীবনজয়ী: হাসিব বাংলাদেশে প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল তোমার?
মীর হাসিবঃ ২০২৩ সালের জুলাই মাসে খুব গরম একটা দিনে এসে পৌঁছালাম তোমাদের শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। প্লেন থেকে যেই না নেমেছি মনে হলো কে যেন আমার গালে জোরসে একটা চড় বসিয়েছে। ঢাকার গরম বাতাস আমাকে বুঝি এভাবে স্বাগতম জানালো বাংলাদেশের মাটিতে। ঢাকার আবহাওয়া কোনো বদমেজাজি স্কুলমাস্টারের চেয়ে কম না। বিশ্বাস করুন, যারাই ইন্ডিয়া, বিশেষত কাশ্মীর থেকে আসে, তাদের প্রত্যেকের একই অনুভূতি হয়।
যাইহোক, এরপরে অবশ্য অবাক হওয়ার পালা ছিল। আসার আগে শুনেছিলাম বাংলাদেশ অনেক গরীব। চোর-ডাকাতের খপ্পরে পড়তে পারি। সেই সাবধানতাও ছিল। কিন্তু এয়ারপোর্ট থেকে রাস্তায় এসে বিষ্ময়। গরীব দেশের এ কি অবস্থা! ফ্লাইওভার, উঁচু বিল্ডিং, বড় শপিংমল, রিসোর্ট কি নেই এখানে! পরে জানলাম উঁচু বিল্ডিং, বড় শপিংমল এসব মূলত গুলশান, বনানী, ধানমন্ডিতে। আমি থাকি ধানমন্ডিতে। এসব জায়গা দেখে গরীব দেশ ভাবার সুযোগ নেই। আমি আমার অবচেতন মনে ধরেই নিয়েছিলাম এটা কোনো এক অজপাড়া গাঁ হবে। কিন্তু, না৷
জীবনজয়ী: ধানমন্ডি পছন্দ?
মীর হাসিবঃ অবশ্যই। এটা খুব সুন্দর জায়গা। বিশেষ করে সাত মসজিদ রোড আমার খুব পছন্দের জায়গা।
জীবনজয়ী: তা বাংলাদেশের মানুষজন কেমন লাগছে? বন্ধু হিসেবে কেমন?
মীর হাসিবঃ একটা মজার কথা বলি। আমার হাইট ছয় ফুট এক ইঞ্চি। এটা দেখে বেশিরভাগ মানুষ আমাকে পাকিস্তানি ভাবে। বলে, "এই তুমি কি পাকিস্তান থেকে এসেছো?". আমি বলি, " আরে না। আমার বাড়ি কাশ্মীরে।" তখন তারা বলে, "তাই নাকি! কাশ্মীর! সে তো পৃথিবীর স্বর্গরাজ্য! আবার কেউ কেউ বলে, “তা কাশ্মীরের কিছু অংশ তো পাকিস্তানেও আছে। তুমি কি মনে করো, তোমরা পাকিস্তানের সাথে থাকলে ভালো হতো? তুমি কি চাও? " মানে আলাপ তখন এরকম রাজনৈতিক দিকে চলে যায়। কেউ কেউ যে একটু আধটু ক্ষিপ্ত হয়ে যায়না তা না। এসব বাদ দিলে ঢাকা আমার বেশ ভালোই লাগে। যাদের সাথে আমি পড়ি, তারা এরকম না৷ তারা বেশ শান্ত। তাদের থেকে এরকম প্রশ্ন আসেনা৷
জীবনজয়ী: তারমানে তারা বেশ লক্ষ্মী ছেলে, কি বলো?
মীর হাসিবঃ তা তো বটেই। আর মেডিকেল পড়ুয়া ছেলেরা তো লক্ষ্মীই হয়। এই যেমন আমি! অন্য ছেলেরা একটু আধটু দুষ্টু হয়।
জীবনজয়ী: বাঙালী সহপাঠীদের পছন্দ করো?
মীর হাসিবঃ তা তো করিই। এক কথায়, দে আর কাইন্ড।
জীবনজয়ী: বাঙালি বন্ধু-বান্ধব কেমন হয়েছে তোমার?
মীর হাসিবঃ অনেক! তুমি জানো, শুধু আমার কলেজেরই না অন্য মেডিকেল কলেজেও আমার বাঙালি বন্ধু আছে।
জীবনজয়ী: তাই নাকি! বাহ! তা তোমরা ঘুরতে টুরতে বের হও সবাই মিলে? নাকি মেডিকেলের লক্ষ্মী ছেলেরা শুধু পড়াশোনাই করে?
মীর হাসিবঃ কি যে বলো! তুমি জানো আমি তোমাদের দেশের কতো জায়গায় ঘুরতে গেছি আমার বন্ধুদের সাথে? দাঁড়াও তোমাকে বলি। আমি চিটাগাং, সীতাকুণ্ড, সিলেট গেছি। এরমধ্যে চিটাগাং গেছি দু’বার। সামনে সেন্ট মার্টিনস যাবো। কুয়াকাটাতেও গেছিলাম।
জীবনজয়ী: বাহ! তুমি তো অনেক ঘুরে ফেলেছো!
মীর হাসিবঃ আমি এই শহরেও ঘুরে বেড়াতে খুব পছন্দ করি। আমি সকালে বের হই আর বলতে পারো প্রতিদিনই লেট নাইটে ফিরি।
জীবনজয়ী: তোমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগলো কোন জায়গাটা বলো তো এতসবের মধ্যে?
মীর হাসিবঃ সিলেটে সাদাপাথর আর লালাখাল। লালাখালের নামের মধ্যে লাল কিন্তু পানি আবার নীল রংয়ের। এরপাশে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখে আমার কি মনে হয়েছে জানো? মনে হয়েছে আমি মালদ্বীপে আছি। এত পরিষ্কার পানি! তারপর শ্রীমঙ্গলের রাস্তা খুব ভালো লেগেছে। ওখানে চা বাগান আছে। কুয়াকাটা গেছিলাম। এই জায়গাটাও চমৎকার। চিটাগাংয়ে সী বিচে গেছিলাম। ওহহো, মাওয়া গেছিলাম দেখতে। ওখানে দারুণ একটা মাছবাজার আছে।
জীবনজয়ী: তুমি মাছ খাও?
মীর হাসিবঃ হ্যাঁ। রুই মাছ সবচেয়ে বেশি পছন্দ আমার। সিলেটের একটা রেস্টুরেন্টে রুই মাছ খেয়েছিলাম। সেটা এখনও মুখে লেগে আছে৷ আর ধানমন্ডিতে খেতে বের হলেই রেস্তোরাঁয় গিয়ে আগে মাছ অর্ডার করি। অবশ্যই রুই মাছ।
জীবনজয়ী: ঢাকায় কোন কোন জায়গায় ঘোরো তোমরা বন্ধুরা মিলে?
মীর হাসিবঃ তোমাকে বললাম না, বাঙালি ছেলেরা যারা মেডিকেলে পড়ে তারা একটু বেশিই লক্ষ্মী। তো এদেরকে নিয়ে ঘোরা বিশেষ করে হ্যাঙআউট করা খুবই ঝক্কির কাজ। বেশিরভাগ সময়েই বলবে, ''দোস্ত, যাবোনা , ভাল্লাগেনা, ঘুম পাচ্ছে, বের হবোনা, ঘুমাবো''। খুবই বোরিং।
জীবনজয়ী: তুমি তো বাঙালী মেয়েদেরকে নিয়ে কিছু বলছোনা! এরাও বোরিং?
মীর হাসিবঃ উঁহু। বাঙালি মেয়েদেরকে শাড়ীতে খুব ভালো লাগে।
জীবনজয়ী: এটা কিন্তু প্রশ্ন ছিলনা!
মীর হাসিবঃ কিন্তু এটা তো সত্যি কথা। যাইহোক, এখানকার মেয়েরা সম্পর্কের মুল্য বোঝে। সবচেয়ে বড় কথা, এখানকার মেয়েরা অনেক সিম্পল, সহজ সরল।
জীবনজয়ী: তুমি তো অনেক কিছুই জেনে গেছো দেখছি!
মীর হাসিবঃ হ্যাঁ। কারণ আমার প্রেমিকা বাঙালি। আর, মজার বিষয় কি জানো? ও কিন্তু অন্য একটা মেডিকেল কলেজে পড়ে।
জীবনজয়ী: বাহ! অভিনন্দন। আচ্ছা, নিজের দেশকে মিস করো খুব বেশি?
মীর হাসিবঃ করি। মাকে মিস করি। তবে সত্যি কথা হচ্ছে আমার বাড়ির চেয়ে এখানেই বেশি ভালো লাগে। বাড়িতে তো আমরা খুব বেশি বাইরে থাকতে পারিনা। জানো নিশ্চয়, আমাদের ওখানে বেশ কড়াকড়ি। আর বাড়িতে বসে থাকা, টিভি দেখা এসবই।
জীবনজয়ী: আমাদের দেশের আর কি কি ভালো লাগে?
মীর হাসিবঃ তোমাকে একটা ঘটনা বলি। গত ঈদে আমি এখানেই ছিলাম। বন্ধুরা আমাকে নিয়ে গেছিল মাওয়াতে আমার মন ভালো করতে। এরপর, এক বন্ধুর বাড়িতে দাওয়াত ছিল। ফেরার সময় ওর আম্মি আমাকে মাংস দিয়েছিলেন। আমি বাসায় এসে দেখি প্রায় ১২ কেজি গরুর মাংস! আমি এটা দেখে যেমন অবাক হয়েছি তেমন খুশিও হয়েছি। পরে জানলাম এটা এখানকার বেশ কমন একটা প্র্যাকটিস। এই দেশের মানুষ খুব মিশুক। তারা মানুষকে খুব আপন করে নিতে পারে।
জীবনজয়ী: তোমার সাথে কথা বলে আমার মনে হয়েছে তুমিও খুব মিশুক।
মীর হাসিবঃ থ্যাঙ্ক ইউ! তোমার সাথে কথা বলে ভালো লেগেছে আমারও।
জীবনজয়ী: তুমি তো বেশ ভালো বাংলা বলো!
মীর হাসিবঃ আমি তো অনেক দিন হয়ে গেলো আছি তোমাদের দেশে।
জীবনজয়ী: তোমার সঙ্গে কথা বলে অনেকে ভালো লাগলো, হাসিব। ধন্যবাদ তোমাকে। ভালো থেকো।
মীর হাসিবঃ তোমাকেও ধন্যবাদ। ভালো থেকো।