রসিঘর

প্রতিটি মানুষকে চিনেছি রান্নাঘরে এসে


  • সুমাইয়া রহমান তুলি   ঢাকা |
  • প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ২২:৫৪
রসিঘর
ছবি: এআই

বিশ্ববিদ্যালয়ের হল জীবন যেন এক রঙিন ক্যানভাস। বিচিত্র অনুভূতির মিশেল। প্রতিটি মুহূর্ত একেকটি রঙের ছোঁয়া। এই জীবনের অনন্য অধ্যায় আমার প্রিয় কবি সুফিয়া কামাল হল; যাকে বলে সেকেন্ড হোম! ছিমছাম,সুন্দর, সাজানো, কোলাহলমুক্ত হল। হলের প্রতিটি স্থান স্মৃতির পাতায় রাখা। সবকিছুর মধ্যে আমার প্রিয় স্থান—আমার রুম প্রত্যয় ৫১১, আর পাশের রান্নাঘরটা। 

আজকে শুধু রান্নাঘরটার কথা বলব। 

এই রান্নাঘরটাকে আমার শুধু রান্নাঘর মনে হয় না। এই ছোট্ট স্থানটায় শত মানুষের গল্প। এখানে এলাকা মসলা মিলেমিশে ভিন্ন এক সুগন্ধ ছড়ায়। সেই ভাসতে থাকে সব মানুষের সংস্কৃতি, মায়ের গল্প, হাসি-আনন্দের ছড়াছড়ি। ধর্ম, বর্ণ, জেলার ভেদাভেদ ভুলে এখানে এসে আমরা রান্না করি। 

আমার ব্লকের প্রতিটি মানুষকে চিনেছি রান্নাঘরে এসে। ব্লকের বড় আপু, ছোট বোনদের সাথে পরিচয় হয়েছে রান্নাঘরে সবজি কাটাকুটির মাঝখানে, অথবা ডালের বাগাড় দিতে দিতে অথবা একটু তরকারিটা গরম করতে দেওয়ার জায়গা চেয়ে, অথবা খাওয়া শেষে বাসন ধুতে ধুতে। বাসন ধোয়ার কথায় একটা কথা মনে পড়ে গেল। আমার বান্ধবী কেয়া সবসময় বাসন ধোয়ার পরিবর্তে বলত, “রান্নাঘর থেকে বাসনটা ভাসায় আন।” আমি তখন খুব হাসতাম ওর কথা শুনে।

এই রান্নাঘরে ফাহমিদা আপুর সাথে আমার দীর্ঘদিনের মনোমালিন্য ঠিক হয়ে গিয়েছিল। আপু হল ছেড়ে দিয়েছে। এখনো মনে পড়ে, আপুর সাথে আমার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। একদিন একটা বিষয় নিয়ে আপুর সাথে মনোমালিন্য হয়েছিল। তারপর দীর্ঘদিন দুজনে সাথে কথা বলিনি। একদিন রুমে ইফতার উপলক্ষে রান্নাবান্নার আয়োজন চলছিল। আপু রান্নাঘরে মরিচ কাটছিল।আমি তখন আপুকে বললাম, “আপু আমাকে দেন আমি কেটে দেই।” আপুও দিল। তারপর থেকে আবার সবকিছু আগের মতো হয়ে গিয়েছিল। রান্নাঘরটা হয়তো চেয়েছিল তার কাছে যেন কেউ মন ভার করে না যায়! 

ক্লাস, পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট সব কিছুর চাপে ব্যস্ত সময় কাটিয়ে একটু অবসর পেলেই আমাদের প্রথম পরিকল্পনা থাকে রুমের সবাই একসাথে খাওয়া-দাওয়া করা। এমনই একটি দিন ছিল ১৪ নভেম্বর ২০২৪। 

রুমে দুজন নতুন সদস্য এসেছে জুলফা এবং লক্ষ্মী। তাদেরকে নিয়ে একসাথে বসে এখনো খাওয়া হয়নি। রুমে আমরা সাত জন বাসিন্দা। সবাই মিলে আগের দিন রাতে ঠিক করলাম কী কী রান্না হবে। আমি, কেয়া আর ঋতু আমরা তিনজন সমবয়সী। কেয়া আর আমি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের আর রিতু দর্শন বিভাগের। ইসরাত আপু স্বাস্থ্য অর্থনীতিতে; আমাদের সিনিয়র। জুলফা, লক্ষ্মী আর স্নেহা জুনিয়র। 

কী কী রান্না করব ঠিক করে নিলেও হাঁড়ি-পাতিল নিয়ে হয়ে গেল একটা সমস্যা। আমাদের হাঁড়ি-পাতিলে গরুর মাংসের ছোঁয়া আছে তাই লক্ষ্মী সেটায় খেতে পারবে না। তাই লক্ষ্মীর পছন্দ অনুযায়ী কোন রুমে ছোঁয়াহীন হাঁড়ি-পাতিল আছে খোঁজ নিয়ে জোগাড় করলাম। 

আমার আর কেয়ার সকাল বেলা পরীক্ষা ছিল। আমি আর কেয়া পরীক্ষা দিয়ে বাজারে গেলাম। রান্নার মেন্যু পোলাও, মুরগির রোস্ট, ডিম ভুনা, বেগুন ভাজা আর রাইতা। সেই অনুযায়ী বাজার করে নিয়ে আসলাম দুইজনে। শুরু হলো আমাদের রান্নাঘরের উৎসব।

স্নেহা নিল মুরগি ধোয়ার দায়িত্ব। আমি পেঁয়াজ রসুন কাটতে শুরু করলাম। আর কেয়া মসলা বাটাবাটি করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কেয়ার কথা, “সব মসলা পাটায় না বেটে দিলে রান্না ভালো হবে না।” ইশরাত আপু আর রিতু বাইরে কাজে ছিল। তারা আসতে আসতে আমরা কাজ একটু এগিয়ে রাখলাম। লক্ষ্মী মেয়েটা সারাদিন ব্যস্ত থাকে ক্লাস আর টিউশনে। তাকে বলে দিলাম যেখানেই থাকো খাওয়ার সময় হাজির থাকতে হবে। আর জুলফা এসে কাজ করতে চাইছিল তবে আমরা কোনো কাজ করতে দিলাম না। কারণ আমাদের এই আয়োজন একজন অনাগত সদস্যের জন্যও ছিল! 

কাটাকুটি, বাটাবাটি শেষে কেয়া রোস্ট রান্না শুরু করে দিল। রোস্টের জন্য একে একে মুরগিগুলো ভাজতে শুরু করল। আমি ফুলটুসি; একটু কাজ করেই ক্লান্ত হয়ে গেছিলাম! ইশরাত আপু আর রিতুও এর মধ্যে চলে এসেছেন। রিতু ডিম ভুনার দায়িত্ব নিল। স্নেহা করল বেগুন ভাজা। রান্নার সুঘ্রাণে চারপাশ ম-ম করছিল। আমি আর ইসরাত আপু রাইতার জন্য শসা কাটলাম। আমি একটু পর পর একেকটা রান্নার ভিডিও ক্লিপ নিচ্ছিলাম। লক্ষ্মীও বলে রেখেছিল, “আপু রান্নার ভিডিও রাখিয়েন, আমি এডিট করে ভিডিও পোস্ট করব।”

হৈ-হুল্লোড়ের মধ্য দিয়ে আমাদের রান্না শেষ হলো। রান্না করে সবার ক্ষুধা লেগে গিয়েছিল। আমি তো রান্নাঘরেই এটাসেটা থেকে একটু একটু খাচ্ছিলাম!

রুমের ফ্লোরে একটা চাদর বিছিয়ে সবগুলো আইটেম রান্নাঘর থেকে এনে একসাথে রাখলাম। এবার খাওয়ার পালা। কেয়া ছোট্ট একটা বাটি নিয়ে রেস্টুরেন্টের স্টাইলে সবার প্লেটে পোলাও সাজিয়ে দিল। একটা প্লেট ছবি তোলার জন্য সুন্দর করে সাজানো হলো। স্মৃতি হিসেবে রাখার জন্য সবাই কয়েকটা সেলফি তুলে নিলাম। তারপর সেই কাঙ্ক্ষিত ভোজে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়লাম। সবগুলো রান্না বেশ মজার হয়েছিল। 

রান্না আর রান্নাঘরের সময়টা আমাদের জন্য এক ধরনের ফ্রি মানসিক থেরাপি সেশন। এখানে রাগ, দুঃখ, অভিমান সবকিছু ভুলে গিয়ে এক হয়ে তৈরি করি আনন্দের ব্যঞ্জন! হলের রান্নাঘরটা না থাকলে হয়তো আমাদের এই মেলবন্ধন, সম্প্রতি, ঐক্য হতো কিনা কে জানে! 


ক্যাটাগরি: রসিঘর

         

  রেটিং: ২.৭

এই বিভাগের আরও পোস্ট

অসাধারণ সাধারণেরা

রবিনহুড বলে কেউ কি ছিলো কোনোকালে?

  • সায়মা কবির বিন্তি|
  •  ৩০-০৪-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

আমরা

আমাদের সম্পর্কে

  • জীবনজয়ী ডেস্ক |
  •  ৩০-০৪-২০২৬
ক্যাটাগরি: আমরা

অসাধারণ সাধারণেরা

বৃক্ষমাতা ওয়াঙ্গারি মাথাই

  • মোঃ কামরুল হাসান |
  •  ৩০-০৪-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

অসাধারণ সাধারণেরা

জোসে মুজিকা : এক সাধারণ মানুষের অসাধারণ দর্শন

  • এহতাছুন আফরিন ইভা |
  •  ৩০-০৪-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

সাময়িকী

বব মার্লের নাইন মাইল গ্রাম

  • সজীব কুমার মন্ডল|
  •  ৩০-০৪-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী