ফ্রিজ ঠিকমতো কাজ করছে না, বৈদ্যুতিক পাখাটাও ঘুরছে না, কিংবা সুইচগুলো প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে, এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজন একজন দক্ষ বিদ্যুৎ মিস্ত্রির। স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যুৎ মিস্ত্রি বললে আমাদের মনে একজন ছবি পুরুষের ভেসে উঠবে। কিন্তু কী হবে যদি দরজা খুলেই চোখে পড়ে এক নারীর আত্মবিশ্বাসী চোখ, হাতে স্ক্রু ড্রাইভার আর কোমরে টুলবেল্ট? অবাক হবেন না- তিনি একজন 'আলো আপা', করাচি শহরের বিদ্যুৎ বিপ্লবের প্রতীক!
পাকিস্তানের মতো রক্ষণশীল একটি দেশের এই সাহসী নারীরা ‘রশনি বাজি’ নামে পরিচিত, যার ইংরেজি অর্থ 'Light Sisters'- আর বাংলায়, তারা যেন প্রত্যেক ঘরের ‘আলো বাহক’। পুরুষতান্ত্রিক প্রতিচ্ছবির গা ছমছমে দেয়াল ভেঙে এই নারীরা এসেছেন বিদ্যুতের ভাষায় আলো ছড়াতে, সচেতনতা গড়তে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।
পাকিস্তানে বৈদ্যুতিক সমস্যার হার অনেক বেশি। উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ গ্রাহকদের কাছে পৌঁছানোর আগেই হারিয়ে যায়। বিদ্যুৎচুরি, ভাঙা ও ত্রুটিপূর্ণ মিটার, দুর্বল অবকাঠামো- পাকিস্তানে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার দুর্বলতার অন্যতম উদাহরণ।
২০২০ সালের ভয়াবহ বন্যায় করাচির ঘরে ঘরে ঘটে যাওয়া বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনায় বহু নারী-শিশুর মৃত্যু যেন সেই দুর্ভাগ্যকে তীব্র করে তোলে। করাচী ইলেকট্রিক (কে-ইলেকট্রিক) এই সমস্যা মোকাবিলা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে শুরু করে 'রশনি বাজি'- তখন তা শহরটিতে এক বিদ্যুৎ বিপ্লবের সূচনা মাত্র।
২০২০ সালের করাচির সেই বন্যা শুধু রাস্তাঘাট ধ্বংস করেনি, শোকে ভরিয়ে দিয়েছিল অসংখ্য ঘর। ছোটখাটো বৈদ্যুতিক ত্রুটিগুলো তখন পরিণত হয় মরণফাঁদে। বহু নারী ও শিশুর প্রাণহানি ঘটে অনাকাঙ্ক্ষিত বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনায়। এই মর্মান্তিক দৃশ্যই কে-ইলেকট্রিক -এর কাছে এক যুগান্তকারী শিক্ষা হয়ে আসে। প্রতিষ্ঠানের সাবেক পরিচালক জেহরা মেহেদি জানান, “ওই অভিশপ্ত বন্যা-ট্রাজেডি থেকেই শুরু হয় 'রশনি বাজি'-র যাত্রা। মূল উদ্দেশ্য ছিল একটাই- বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা গড়ে তোলা, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগকে বৈধ সংযোগে রূপান্তরিত করা।” ২০২১ সালের জানুয়ারিতে, খুব বেশি প্রচার না করেও বেশ ভালোরকম সাড়া পাওয়া যায়; ৪০০ থেকে ৫০০ জন নারীর আবেদন জমা পড়ে প্রজেক্টে যোগদানের জন্য। সেখান থেকে বাছাইকৃত ১০০ জন নারীর জন্য শুরু হয় একটি নয় মাসব্যাপী কঠোর প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। শুধু স্ক্রু ড্রাইভার ঘোরানো নয়- প্রশিক্ষণে তাঁদের শেখানো হয় যোগাযোগের কৌশল, মিটার ও বিল রিডিং, টেকনিক্যাল দক্ষতা, এবং বাস্তবসম্মত সমস্যা সমাধানের পদ্ধতি।
সমস্ত ধাপ শেষ করে তারা হয়ে ওঠেন নতুন পরিচয়ের অধিকারী- 'Certified Women Electricians' বা প্রত্যয়িত নারী বিদ্যুৎ মিস্ত্রি। চোখে স্বপ্ন, হাতে যন্ত্র, আর হৃদয়ে সেই দীপ্তি নিয়ে তাঁরা নামেন মাঠে- অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে।
প্রশিক্ষণ শেষ হলে অনেক আলো আপা পেয়েছেন বিশেষ দায়িত্ব, যেমন- গ্রিড অপারেটিং অফিসার, মিটার ডেটা বিশ্লেষক, কিংবা বিদ্যুৎ রক্ষণাবেক্ষণ কর্মী হিসেবে। বাকিরা নিজেদের প্রশিক্ষিত দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে হয়ে উঠেছেন নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ মিস্ত্রি। কিন্তু তাদেরকে শুধু টেকনিক্যাল ক্ষমতায় সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলায় ও নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কারাটে প্রশিক্ষণ ও নগরচারণে স্বাধীনতা নিশ্চিত ও যাতায়াত সহজ করতে মোটরসাইকেল চালনার প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়। বিদ্যুৎ-প্রযুক্তির সঙ্গে সঙ্গে আত্মরক্ষার কৌশল; আলো আপাদের হাতে যেন দুইধরনের আলো- প্রযুক্তি ও প্রতিরোধ।
প্রতিটি আলো আপার জন্য নির্ধারিত হয়েছে নিজস্ব কর্ম-এলাকা। তারা সেখানে সচেতনতা বৃদ্ধিতে লিফলেট বিতরণ করেন, দরজায় দরজায় গিয়ে পরামর্শ দেন, এবং বিনামূল্যে মেরামত করেন ঘরোয়া বৈদ্যুতিক ত্রুটি। যদি সমস্যা বেশি জটিল হয় তখন তারা টিমকে খবর দেন আর তারা এসে সেটা ঠিক করে দেন। এভাবে একসাথে মিলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে ফিরিয়ে আনেন ছন্দে।
বিদ্যুৎ চুরির বিরুদ্ধেও এই নারী শক্তির তীক্ষ্ণ নজর এখানে বিশেষ লক্ষণীয়। মূল পাওয়ার লাইন থেকে চোরা লাইনে বিদ্যুৎ চুরি তদারকি করতে গিয়ে আলো আপারা এখন পর্যন্ত প্রায় ৪৫০ টন অবৈধ বৈদ্যুতিক তার জব্দ করেছেন। এছাড়া তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৃতিত্ব যে তারা ৮ লাখ পরিবারের কাছে নিরাপত্তা-সচেতনতা পৌঁছে দিতে পেরেছেন, এবং ২.৫ লক্ষ অবৈধ সংযোগকে রূপান্তরিত করেছেন বৈধ সংযোগে। তাদের কাজের দ্যুতি শুধু ঘরে নয়, সমাজের বুকে ছড়িয়ে পড়েছে আগুনের রেখার মতো। করাচির আলো আপাদের মধ্যে একজন হলেন সোয়েইব দুরদানা। তিনি শুরু থেকেই এই প্রোগ্রামের সাথে যুক্ত। আজ তিনি প্রশিক্ষিত বিদ্যুৎ মিস্ত্রি, সমাজে আলো ছড়ানো এক নারী কর্মী। কিন্তু তার যাত্রা শুরু হয়েছিল এক ভয়ংকর শোকের ঘায়ে। সাত বছর আগে, তার ছোট্ট মেয়েটি অসাবধানতাবশত বৈদ্যুতিক শকে আক্রান্ত হয়। আগুনের আঁচে তার দুটি পা ভয়াবহভাবে পুড়ে যায়- মায়ের চোখে তখন ছিল শুধু অসহায়তা আর অপরাধবোধ। এই দুর্ঘটনা তাকে আলো আপা হিসেবে প্রশিক্ষণ নিতে উদ্বুদ্ধ করে। তিনি জানান, পুরুষশাসিত সমাজে নারীদের এখনও দুর্বল হিসেবে দেখা হয়। যার ফলে কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
একবার একটি বাসায় কাজ করার সময় এক ব্যক্তি তাকে হেনস্থা করার চেষ্টা করে। তবে কারাটে প্রশিক্ষণের কারণে তিনি আত্মরক্ষায় সক্ষম হন এবং আক্রমণকারীকে সহজেই ধরাশায়ী করেন। তার সাহস ও আত্মবিশ্বাস দেখে অন্যান্য মেয়েরাও বাড়ির বাইরের কাজে যেতে শুরু করেছে। এমনকি তার মেয়েও বলে যে বড় হয়ে সে তার মায়ের মতো হতে চায়। তাই সোয়েইব দুরদানা আজ শুধু একজন বিদ্যুৎ মিস্ত্রি নন; তিনি বিদ্যুৎ দুর্ঘটনার বিরুদ্ধে একটি আলোকিত প্রতিবাদ, তিনি নারীর আত্মবিশ্বাসের এক জীবন্ত নিদর্শন। তাঁর গল্প বলে, যন্ত্রণাও কখনো কখনো শক্তির জন্ম দিতে পারে। ‘আলো আপা’রা যেমন বিদ্যুতের তার জোড়া দেন, তেমনই সমাজের চিরায়ত মানসিকতার শিকড়েও তারা দিয়ে দেন নতুন সংযোগ। সোয়েইব দুরদানা হলেন সেই পরিবর্তনের প্রথম স্পার্ক। ত্রিশ বছর বয়সী নাজিয়া শেহেরও একজন আলো আপা। একসময় তিনি ছিলেন একজন গৃহকর্মী, করাচির এক কোণায় দিনশেষে ক্লান্ত হাতে থালা ধুয়ে জীবনের হিসেব মেলাতেন। কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারিতে, তার স্বামী চাকরি হারান। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সেই দিনগুলোতে নাজিয়া নিজেই ধরেন সংসারের হাল।‘রশনি বাজি’-তে যুক্ত হয়ে প্রশিক্ষণ নেয়া শেষে এখন তিনি নিজেই বাড়ির সকল বৈদ্যুতিক কাজের পাশাপাশি প্রতিবেশীদেরও নিঃস্বার্থ সহায়তা দেন। আবার, বাড়তি আয়ের জন্য শহরে বিদ্যুৎ মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করেন। নাজিয়া জানান, নারী বিদ্যুৎকর্মী হবার কারণে বাড়ির মেয়েরা তার সঙ্গে সহজেই যোগাযোগ করতে পারেন। তার স্বামীও এসে পাশে দাঁড়িয়েছেন, লিঙ্গবৈষম্যের আবরণ ভেঙে স্ত্রীকে গর্বের সঙ্গে সম্মানিত করেছেন, পাশাপাশি ঘরের কাজেও অংশ নিয়েছেন সহানুভূতির হাতে।
‘রশনি বাজি’ উদ্যোগটি আজ পাকিস্তানে নারীর ক্ষমতায়নের প্রতীক, আর আলো আপাদের হাত ধরে পাকিস্তানে এসেছে কর্মসংস্থানের উজ্জ্বল এক দিগন্ত। দেশের ইতিহাসে প্রথম প্রত্যয়িত নারী বিদ্যুৎ মিস্ত্রির কারিগর তারাই- যারা শুধুই বিদ্যুতের সমস্যা মেরামত করেন না, সমাজের পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোরও শিকড় নাড়িয়ে দেন। এই প্রকল্প পেয়েছে অনেক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা, একইসাথে আলো আপারা পেয়েছেন সম্মান, মর্যাদা ও দৃঢ়তা। করাচির মানুষ এখন তাদের নতুন চোখে দেখে- আর তাদের চোখেও ভেসে ওঠে এক আশাবাদী ভবিষ্যৎ, যেখানে লিঙ্গবৈষম্য কমে আসবে, আর মেয়েরাও সানন্দে ঘরের বাইরে কাজ দিয়ে নিজের পরিচয় খুঁজে নেবে।