বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে একদিন


  • এমরান চৌধুরী   ঢাকা, বাংলাদেশ |
  • প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০০:৩৭
ক্যাম্পাস
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি: ইমরুল আহসান

ধান-নদী-খালের বরিশালে যাবার ইচ্ছা ছিল অনেক দিনের। সময়-সুযোগ হয়ে উঠছিল না। গত বছর হঠাৎ একদিন আমাদের রিসার্চ সুপারভাইজার স্যার একাডেমিক কাজে বরিশাল যাবেন বলে জানালেন। উনি বললেন, “চাইলে তোমরা তিনজন আমার সাথে যেতে পারবে।” এটা শুনে আমরা তিন বন্ধু উৎফুল্ল হয়ে উঠি। আমরা তিনজন হলাম ইন্দ্র, মন্ডল এবং আমি।

নির্দিষ্ট দিনে ব্রিটিশ কাউন্সিলের সামনে থেকে আমাদের যাত্রা শুরু হয়ে যায়। প্রাতঃকাল। জ্যামহীন রাস্তা। মেডিক্যাল থেকে ফ্লাইওভারে চড়ে গাড়ি যাত্রাবাড়ী পার হয় কয়েক মিনিটে। অতঃপর মাওয়ামুখী এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। রাস্তাটা এত সুন্দর! পথে নাস্তা, গাড়িতে গ্যাস নেওয়া সহ ঘণ্টাখানেকের মধ্যে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। ভাবা যায়!

জীবনজয়ীর বরাতে আগে থেকে পরিচিত সোহান ভাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী। সাথে উনার দুজন জুনিয়র। উপমা এবং নুসরাত। কয়েক ঘণ্টার আলাপে এদেরকে দারুণ মানুষ হিসাবে পেয়েছি।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান শহরের যান্ত্রিকতা থেকে দূরে। প্রায় গ্রামীণ পরিবেশে গড়ে তোলা সুপরিকল্পিত ক্যাম্পাস। পাশেই প্রশস্ত কীর্তনখোলা। নদীর স্রোত দেখতে কার না ভালো লাগে? মন খারাপ বা একাকিত্ব দূর করতে উপমা নদীর পাড়ে সময় কাটাতে চলে যায়। নুসরাতও তাই। এরা আমাদের ক্যাম্পাস ঘুরিয়ে দেখালো। গল্প হলো অনেক। তারা আমাদের কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা শুনতে চাইলো। ক্যাম্পাস ঘোরা শেষ করে টং দোকানে চায়ে বসি আমরা।

নুসরাতকে শুরুতে একটু চুপচাপ দেখেছিলাম। পরে দেখি কথা বলে! কথা শুনতে শুনতে মনে হলো এই মেয়ে স্বপ্নচারিণী। কিছুটা অ্যাডভেঞ্চারাসও। এদিকে আবার মেধাবী ছাত্রী। কয়েক সেমিস্টার ধরে তাদের ব্যাচে প্রথম স্থানে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্রী হিসেবে আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী। ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্স নামে একটা সংগঠন খোলার ইচ্ছা আছে। প্রাথমিক আলাপ হয়ে গেছে কয়েকজনের সঙ্গে। দেখলাম ঢাকায় বেড়ে ওঠা মেয়েটি বরিশাল ক্যাম্পাসটাকে খুব আপন করে নিয়েছে। উপমা শুরু থেকে আমাদের সঙ্গে কথা বলে যাচ্ছিল। মূলত বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা গল্প। মেয়েটির কথা শুনতে বেশ। ডিপার্টমেন্টের একটা নির্বাচনে বিপুল ভোটে জিতেছে উপমা। ১২০ ভোটের মধ্যে ১০৯টি তার বাক্সে! দারুণ ব্যাপার। উপমা জানায় ভোটে জেতার ব্যাপারটা তার মধ্যে কিছু পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। সবার সাথে সুসম্পর্ক রাখা, সমস্যার কথা শোনা, আত্মবিশ্বাসের সাথে নিজের চিন্তাটাকে গুরুত্ব দিতে শিখেছে সে। ভোটের এই অভিজ্ঞতা পরবর্তী জীবনেও কাজে লাগাতে চায় উপমা। উপমার মধ্যে আত্মবিশ্বাসী এক তরুণীকে দেখতে পাচ্ছিলাম আমি।

সোহান ভাইয়ের কথা আর কী বলবো! ক্যাম্পাসে দেখি উনি খুব পরিচিত মুখ। এদিক-ওদিক থেকে ওনার দিকে সালাম আসছিল। ক্যাম্পাসে থাকাকালীন সাংস্কৃতিক সংগঠনে যুক্ত ছিলেন। আবৃত্তি করেন। নাচেন। তার উচ্চারণ অসাধারণ। বাচনভঙ্গি, কথা বলার সময় পুরো শরীরের পজিটিভিটি আশেপাশের মানুষকে প্রভাবিত করে। শিক্ষকদের সাথে উনার খুব সুন্দর সম্পর্ক। প্রত্যেক শিক্ষককে তিনি পায়ে ধরে সালাম করছিলেন। সোহান ভাই বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গর্বিত অ্যালামনাই। খাঁটি বাঙালি যাকে বলে তার সবটুকুই উনার মাঝে বিদ্যমান। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ-প্রকৃতির সবটুকু সোহান ভাইয়ের মধ্যে ফুটে উঠছিল। আরেকটা কথা, সোহান ভাইয়ের মিটমিট করে হাসার ভঙ্গিটা চমৎকার।

দেখা হলো সানবিন ভাইয়ের সঙ্গে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র। সে সূত্রে আমাদের অগ্রজ। ডিপার্টমেন্টের খোঁজ-খবর নিলেন। পুরাতন দিনের অনেক সুখস্মৃতি বর্ণনা করলেন। ক্যাম্পাসের শ্যাডো এলাকাটিকে অনেক মিস করেন। আমাদেরকে দেখে নস্টালজিক ফিল করছিলেন। সানবিন ভাই জাপান থেকে একটি ডিগ্রি নিয়ে ফিরেছেন বছর খানেক আগে।

আমাদের পেয়ে ভীষণ খুশি হয়েছেন বোঝা গেল। বললেন ওনাকে স্যার নয় বরং ভাই ডাকলে বেশি খুশি হবেন। শুনে আমরা বিস্মিত হলাম। জুনিয়র ভাইদের প্রতি ভালোবাসা দেখে উনার প্রতি শ্রদ্ধা বেড়ে গেল। জোর করে ক্যাম্পাসের মূল ফটকে নিয়ে গেলেন। আইসক্রিম কিনে খাওয়ালেন। উনিও নিলেন একটা। আমাদের আইসক্রিম খাওয়া ঘিরে অসম্ভব সুন্দর একটা দৃশ্য তৈরি হলো। দেখে মনে হচ্ছিল, সানবিন ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জীবনে ফিরে গেছেন। পাশে তিনজন আদুরে জুনিয়র আর সোহান ভাই!

পলাশতলায় কয়েকটি জুটি দেখলাম। এরা সুন্দর করে সেজেগুজে ছবি তুলছে। লাল-নীল-হলুদ শাড়ি পরা নারীরা। ক্যাম্পাসেরই হবে! একেকজনকে হিমুর রূপার মতো লাগছিল। হুমায়ূন আহমেদের হিমু রূপাকে না পেলেও, ক্যাম্পাসের হলুদ পাঞ্জাবি পরা হিমুরা তাদের রূপাকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল।

ফুলে ফুলে ছেয়ে আছে পলাশ গাছগুলো। নয়ন মনোমোহর। ফুলগুলো যেন কিছু একটা বলতে চাচ্ছিল। কোকিলের কুহু কুহু ডাক শুনতে পাচ্ছিলাম। এই না হলে বসন্ত! কিছুক্ষণের জন্য এসে বরিশাল ক্যাম্পাসটির প্রতি ভালোবাসা জন্মে গেল। বিকেলের দিকে ক্যাম্পাস ছেড়ে ঢাকার দিকে রওনা হওয়ার সময় বুকের মধ্যে কেমন যেন চিনচিন করছিল। কী বলে একে?


ক্যাটাগরি: ক্যাম্পাস

         

  রেটিং: ০

এই বিভাগের আরও পোস্ট

অসাধারণ সাধারণেরা

রবিনহুড বলে কেউ কি ছিলো কোনোকালে?

  • সায়মা কবির বিন্তি|
  •  ৩০-০৪-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

আমরা

আমাদের সম্পর্কে

  • জীবনজয়ী ডেস্ক |
  •  ৩০-০৪-২০২৬
ক্যাটাগরি: আমরা

অসাধারণ সাধারণেরা

বৃক্ষমাতা ওয়াঙ্গারি মাথাই

  • মোঃ কামরুল হাসান |
  •  ৩০-০৪-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

অসাধারণ সাধারণেরা

জোসে মুজিকা : এক সাধারণ মানুষের অসাধারণ দর্শন

  • এহতাছুন আফরিন ইভা |
  •  ৩০-০৪-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

সাময়িকী

বব মার্লের নাইন মাইল গ্রাম

  • সজীব কুমার মন্ডল|
  •  ৩০-০৪-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী