তুমুল পরিশ্রমের বদৌলতে ২০১৯ সালে ভর্তি হই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই ক্যাম্পাসের ফুটপাত দিয়ে হাঁটলেও নাকি জ্ঞান অর্জন করা যায়—কোচিংয়ের স্যারদের মুখে এই কথা শুনে মনে মনে ঠিক করে ফেলেছিলাম, এখানেই পড়ব। অবশেষে, আসা গেল স্বপ্নের ক্যাম্পাসে। কষ্ট হবে ভেবে বাবা-মা হলে থাকতে দিতে রাজি ছিলেন না। তারা চাইতেন আমি যেন বাসায় থাকি। আমি কোনোভাবেই রাজি হলাম না। আমি জানতাম, হলে না উঠলে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের আসল রঙটা ধরা পড়বে না। এমনকি জীবনের অনেক কঠিন সত্যকেও মোকাবিলা করা যাবে না।
ভাগ্য ভালো আমার। হলে সিট পেয়ে গেলাম। একে তো রোকেয়া হল—তাও আবার সাত মার্চ ভবনে, যেখানে সিট পাওয়া মানেই নাকি ভাগ্যবানদের তালিকায় নাম ওঠা। পরিবারের সাময়িক বাধা সত্ত্বেও একপ্রকার জোর করেই উঠে পড়ি হলে। অবশ্য আমার হলে ওঠার পেছনে একটা মজার গল্প আছে।
তখন আমার প্রথম সেমিস্টার। ফেব্রুয়ারি মাস। হঠাৎ চোখে পড়ে আন্তঃহল ক্যারাম প্রতিযোগিতার বিজ্ঞপ্তি। অত কিছু না ভেবেই নাম জমা দিয়ে দিই। কিন্তু কেউ আমাকে খেলায় নিতে চায় না। কারণ, সব খেলোয়াড়ই ফাইনাল ইয়ার বা মাস্টার্সের ছাত্রী। আর আমি কিনা ক্যাম্পাসে এসেছি মাত্র দু’মাস হলো। তখনো হলে জায়গা হয়নি। শেষমেশ, আমার হলের এক প্রতিযোগী আপু পরপর দুই ম্যাচ হেরে গেলে তাকে অনুরোধ করি, “আপু, আমি একটা রাউন্ড খেলি?” তিনি রাজি হলেন। অবশেষে সুযোগ এলো! আমি খেলতে বসি, আর সবাইকে চমকে দিয়ে দশ জনের সঙ্গে লড়ে হয়ে যাই চ্যাম্পিয়ন!
টুর্নামেন্ট হচ্ছিল শামসুন্নাহার হলে। সেই হলের প্রভোস্ট ম্যামও তাই উপস্থিত ছিলেন। তিনি আমার খেলা দেখে অনেক মুগ্ধ হন। আমার হলের প্রভোস্ট ম্যামকে ফোন করে বলেন, “তোমার হলের একটা রত্ন এখনো সিট পায়নি, এটা কেমন কথা?” এই ঘটনার এক মাসের মধ্যেই আমি সিট পেয়ে যাই! ক্যারাম ছাড়া ব্যাডমিন্টন ছিল প্রিয়। একবার সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে পায়ে ফ্র্যাকচার হয়। এরপর ব্যাডমিন্টন বন্ধ হয়ে যায়। আমার মা খুব ভালো দাবাড়ু—আমি ততটা না হলেও দাবা খেলতে পারি।
দ্বিতীয় বর্ষে ডাকসু আয়োজিত ‘নেলসন ম্যান্ডেলা’ বিষয়ক রচনা প্রতিযোগিতায় অংশ নিই। গ্রামে বসে লেখা শেষ করে ক্যাম্পাসে ফিরে সেটা জমা দিই শেষ দিনে। দুই দিন পর ফোন এলো। আমি প্রথম হয়েছি! পুরস্কার নিতে যাই ক্লাস শেষে, এক ঘণ্টা দেরিতে। অডিটোরিয়ামে গিয়ে দেখি, শিক্ষামন্ত্রী মেডেল পরাবেন। আমি এক কোণায় গুটিসুটি হয়ে বসে থাকি। সবার শেষে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে আমার নাম ঘোষণা হয়। স্টেজে উঠে মেডেল নিই। কী যে ভালো লাগা কাজ করে!
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে দিয়েছে সহযোগিতাপূর্ণ শিক্ষক, দরকারে ছুটে আসা বন্ধু, অসুস্থ হলে বোনের মতো আগলে রাখা বান্ধবী। আমার প্রথম রুমমেটরা ছিল অসাধারণ—আমি ছিলাম সবচেয়ে জুনিয়র, তবু নির্দ্বিধায় সব বলতে পারতাম।
পড়ালেখায় প্রথম দিকে খুব সিরিয়াস ছিলাম। পরে হয়ে গেলাম একটু ঢিলেঢালা। তবু বন্ধুরা বলত, “তুই পরীক্ষার আগের রাতে পড়ে এত ভালো রেজাল্ট করিস!” আমি হাসতাম, কারণ আমি জানতাম, ওরা খুব একটা ভুল বলছে না।
ক্যাম্পাসে থাকাকালীন বিকেল হলেই বন্ধুরা ফোন দিত। আমি রুম থেকে বের হতাম। টিএসসি গিয়ে গল্প, সঙ্গে হরেক রকম চা খেতাম। এই চায়ের মধ্যে একটা হচ্ছে অপরাজিতা চা বা নীল চা (যার স্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে—জঘন্য!)। ব্যাচ ডে ছিল খুব আনন্দের। ডেকোরেশন, গান, আবৃত্তি, উপস্থাপনা—সব কিছুতেই অংশ নিতাম।
বাতিঘর, পাঠক সমাবেশ, সেন্ট্রাল লাইব্রেরি—আমার সব পছন্দের জায়গা। এসব জায়গায় গিয়ে বসে থাকতাম, কখনো কখনো সঙ্গে ল্যাপটপ নিয়ে। বসে বসে কত ছবি আঁকতাম! চারুকলায় ডাল-ভাত, চিকেন চপ, টিএসসির চা, ফুলার রোডে সাইকেল, কার্জনে ফুচকা, শহীদ মিনারে দুধ চা, হাকিমের লাচ্ছি, আইবিএ-র খিচুড়ি, আর সামাজিক বিজ্ঞানে ফোয়ারার সামনে এক কাপ কফি—সব মিলিয়ে আমার ক্যাম্পাস জীবন ছিল রঙিন, উচ্ছ্বল, প্রাণবন্ত।
এখন জীবন অনেক দূর এগিয়েছে। বাস্তবতা ঘিরে ধরেছে চারপাশে। তবু যখন একটু ফুরসত পাই, এক কাপ চা হাতে নিয়ে ভাবি—“আমাদের গেছে যে দিন, একেবারেই কি গেছে? কিছুই কি নেই বাকি?”